
কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে কাফের বা অমুসলিম ঘোষণাসহ ছয় দফা দাবি পেশ করেছে সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদ। সৌদি আরব, মিসর, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ ও ধর্মীয় স্কলারদের উপস্থিতিতে গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো দ্বিনী ও তৌহিদী জনতার ঢলে সংগঠনটি এই দাবি জানায়।
কাদিয়ানীরা ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের ধারাকে গ্রহণ করে না। তাই কাদিয়ানীদের আর মুসলমান বলা যায় না। তাদের কাফের বা অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। কাদিয়ানীরা বাংলাদেশে সম্প্রতি বিভিন্ন নতুন আস্তানা তৈরি করেছে এবং এদের কার্যক্রম দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
আলেম-উলামারা বলেন, দেশের সংবিধান ও সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে এ ধরনের ধর্মীয় দাবিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে খতমে নবুওয়তের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবাইকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন করতে হবে।
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্য সংখ্যালঘুরা যেভাবে শান্তিতে বসবাস করছে, কাদিয়ানীরাও অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে এদেশে বসবাস করবে। মুসলমানরা তাদের নিরাপত্তা দেবে।
সারাদেশ থেকে বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র ও পীর-মাশায়েখদের ভক্ত আশেকানরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশে এসে খুব সকালেই জড়ো হন। । মৎস্য ভবনের সামনে থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত রাস্তায় জনতার ঢল নামে। তবে সর্বত্রই ছিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এমন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ দেখে সাধারণ মানুষ অভিভূত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস তুলে ফেলেছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল করা হবে। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আল্লাহ রাসূল (সা.)-কে গোটা বিশ্বে রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। রাসূল (সা.) নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। তিনি বলেন, আমরা আখেরি নবী (সা.)-এর কালেমা পড়েই মুসলমান হয়েছি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইনশা আল্লাহ আল্লাহর রহমতে এবং জনগণের সমর্থনে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় সকলের সহযোগিতায় জাতীয় সংসদে খতমে নবুওয়তের প্রস্তাবনা আইনিভাবে মেনে নেব। তিনি বলেন, যারা রাসূল (সা.)-কে শেষ নবী মানে না তারা মুসলমান নয়। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মুসলিম জাতির মধ্যে বিভক্তির কারণেই ফিলিস্তিন, গাজা ও মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে।
এ মহাসম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শীর্ষ আলেমরা। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জমিওয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সভাপতি প্রখ্যাত স্কলার মাওলানা ফজলুর রহমান, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের (ভারত) সভাপতি মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানি, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের মহাসচিব মাওলানা হানিফ জালন্দরি, ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্টের ওয়ার্ল্ড নায়েবে আমির শায়খ আব্দুর রউফ মক্কি, পাকিস্তানের টাউন মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম ড. আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরী, পাকিস্তানের মাওলানা ইলিয়াছ গুম্মান, মাওলানা এরফানুল হাক্কানী, মাওলানা আব্দুল গফুর হায়দারী, মাওলানা সৈয়দ মো. কাফিল বোখারী, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মুফতি আবুল কাসেম নোমানী, মাওলানা সাঈদ ইউসুফ আজাদকাশ্মির এবং মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শায়খ মুসআব নাবীল ইবরাহিম।
মহাসমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খান বক্তব্য দেয়া শুরু করলে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে হৈ চৈ শুরু হয়। একপর্যায়ে জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হবে।
কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ই সর্বশেষ নবী। বিশ্বের সকল আলেম-উলামা, মুফতি ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানী মতবাদকে ইসলামবিরোধী ও ভ্রান্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পৃথিবীর বহু মুসলিম রাষ্ট্র যেমনÑ পাকিস্তান, সিরিয়া, মিসর ও আযাদ কাশ্মীর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে। এছাড়া রাবেতায়ে আ‘লমে ইসলামির সম্মেলনে ১০৪টি দেশের প্রতিনিধিরাও কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করেছেন। এমনকি ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্টের এক রায়েও কাদিয়ানীদের আইনের দৃষ্টিতে অমুসলিম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লামা বাবুনগরী বলেন, মুসলমানদের ঈমান আকীদা হেফাজত রাখতে এবং তাদের ধোঁকাবাজি ও অপতৎপরতা রোধে এখনই কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। এটি হেফাজতের ১৩ দফা দাবির অন্যতম এক দাবি। আমরা আকীদায়ে খতমে নবুওয়তের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবো না। আমরা এ ব্যাপারে দৃঢ়তার সঙ্গে অটল এবং ঐক্যবদ্ধ আছি ইনশা আল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব বলেন, কাদিয়ানী সম্প্রদায় মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার। এরা ইসলামের কোনো পরিভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, কাদিয়ানীরা কাফের। জাতীয় সংসদে আইন পাস করে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, আল্লাহ পবিত্র কোরআনে রাসূল (সা.)-কে শেষ নবী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কাদিয়ানীরা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত মিথ্যা নবীর দাবিদার। ওলা ইসলামের পরিভাষা ব্যবহার করে প্রতারণা করছে। যতক্ষণ পর্যন্ত কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই আমরা শাপলা চত্বরে রক্ত দিয়েছি, ২০২৪-এ জুলাই অভ্যুথানে রক্ত দিয়েছি। কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামীর বর্তমান আমির আল্লামা মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মধুপুর পীর সাহেব ডাক দিলে আবার ৫ মে হবে। ঢাকা ঘেরাও, জাতীয় সংসদ ঘেরাও হবে। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে বাংলাদেশ থমকে দাঁড়াবে। প্রয়োজনে আমরা রক্ত দেবো তবু জাতীয় সংসদে আইন পাস করে কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। সভাপতির বক্তব্যে আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর বলেন, নবীর পরে নবী নাই বেদায়েতের হেদায়েত নাই। কাদিয়ানীরা কাফের। যারা এদের কাফের মনে করবে না তারাও কাফের। মধুপুর পীর সাহেব বলেন, যারা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের প্রতি ¯েœহ-ভালোবাসা দেখাবে তাদের তওবাহ করে ফিরে আসতে হবে। অবিলম্বে কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করুন।
পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, আজকের এই ঐতিহাসিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের বরেণ্য উলামায়ে কেরামের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সকল ঘরানার মুসলমানগণ এই বিষয়ে একমত যে, শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে আর কোনো নবী থাকতে পারে না। যদি কেউ এমন নবী হওয়ার দাবি করে, তাহলে সে ইসলামের গ-ি থেকে বের হয়ে যায়। খতমে নবুওয়ত প্রশ্নে আজ ঐক্যের যে নজিরবিহীন দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যতে তার সুফল অবশ্যই পাওয়া যাবে। প্রিয় বন্ধুগণ, পাকিস্তান থেকে যেসব উলামায়ে কেরাম এখানে যোগদান করেছেন, তারা শুধু হাজিরা দেওয়ার জন্য আসেননি। বরং আপনাদের প্রতি মুসলিমপ্রধান পাকিস্তানি জনগণের ভ্রাতৃত্ববোধ ও গভীর ভালোবাসার পয়গাম নিয়ে এসেছেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দু’টি দেশ নিজ নিজ নীতিতে চললেও মুসলমানিত্ব ও ইসলামের পরিচয়ে আমরা সকলে এক ও অভিন্ন। আমরা এক উম্মত। এক সমাজ। আমরা আজ এক আকীদা নিয়ে কথা বলতে এসেছি। যে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত বন্ধনে আবদ্ধ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত খতমে নবুওয়ত মহাসমাবেশের উদ্যোক্তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, আপনাদের বার্তা আমরা পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য বহন করে নিয়ে যাব। আমরা আশাবাদী, আমাদের দুই দেশের জনগণের ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এই সুসম্পর্ক আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে ইনশা আল্লাহ।
মহাসম্মেলন থেকে সর্বসম্মতভাবে ছয় দফা দাবি সংবলিত একটি ঘোষণাপত্র পেশ করা হয়। দাবি হচ্ছেÑ অমুসলিম ঘোষণ : আহমদিয়া সম্প্রদায় ইসলামের দৃষ্টিতে কাফের সংখ্যালঘু অমুসলিম। তারা ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’ নামে নিজেদের পরিচয় দিতে পারবে না এবং সব ক্ষেত্রে ‘কাদিয়ানী সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত হবে। ইসলামী পরিভাষা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। কাদিয়ানীরা তাদের ধর্মকে ইসলাম আখ্যায়িত করতে পারবে না এবং কালিমা, নামাজ, রোজা, জাকাত, আজান, ঈদ, কোরবানি ইত্যাদি কোনো ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। উপাসনালয় ও নিদর্শন : কাদিয়ানীরা তাদের উপাসনালয়কে মসজিদ নামকরণ করতে পারবে না। সেটি ‘কাদিয়ানী উপাসনালয়’ হিসেবে পরিচিত হবে। এছাড়া সাহাবি, উম্মুল মুমিনিনের মতো কোনো ইসলামী বিশেষ নিদর্শন তারা ব্যবহার করতে পারবে না।
বিয়ে সম্পূর্ণ হারাম : কাদিয়ানীদের সঙ্গে মুসলমানের বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। পরিচয় গোপন করে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জানাজা ও উত্তরাধিকার। কাদিয়ানীদের জানাজা পড়া যাবে না এবং কবরস্থানে তাদের লাশ দাফন করা যাবে না। কাদিয়ানী ও অমুসলমানের মাঝে কোনো উত্তরাধিকারের বিধান প্রযোজ্য হবে না। প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা : কাদিয়ানীরা ইসলাম প্রচারের নামে কোরআনের বিকৃত অনুবাদ কিংবা কোনো বই, পুস্তিকা, লিফলেট ইত্যাদি ছাপতে বা প্রচার করতে পারবে না। ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্ম ইসলামের সুরক্ষা, কাদিয়ানীদের সংখ্যালঘু অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখার স্বার্থে অবিলম্বে উপরোক্ত ঘোষণা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কর্মসূচি : মহাসম্মেলন চার দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, কর্মসূচি হচ্ছে, আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গণস্বাক্ষর, মে ও জুন মাসে প্রতি জেলায় ডিসির কাছে স্মারকলিপি পেশ, আগামী জুলাই থেকে নভেম্বর বিভাগীয় খতমে নবুওয়ত সম্মেলন, আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।