
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। একটা নীল রঙের প্রিজন ভ্যান হুইসেল বাজিয়ে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড় হয়ে ঢাকার চিফ মেট্রপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের প্রধান ফটকে প্রবেশ করে।
প্রিজন ভ্যান ঢুকতে দেখে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারা সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের শাস্তি চেয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রিজন ভ্যানটি দ্রুতগতিতে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানার ভেতরে ঢুকে যায়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যখন আদালতের হাজতখানায়, তখন হাজতখানার সামনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারা তাঁর শাস্তির দাবিতে মিছিল করতে থাকেন।
তখন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের প্রধান উপকমিশনার (ডিসি) তারেক জুবায়ের সিএমএম আদালতের প্রধান ফটক দিয়ে ওপরে ওঠেন। পুলিশ সদস্যদের কড়া নির্দেশনা দেন, কেউ যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। আদালতে প্রবেশের সবগুলো ফটক বন্ধ করা হয়।
আদালতের সামনে অবস্থান নেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তখন হাজতখানার ভেতর থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে বের করা হয়। তাঁকে আদালতের সামনের সড়ক দিয়ে না নিয়ে আদালতের ভেতরের একটি রাস্তা দিয়ে আদালতের সিঁড়ির কাছে নিয়ে আসা হয়।
তখন দেখা যায়, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দুই হাত পেছনে নিয়ে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে হাতকড়া। বুকে পুলিশের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তাঁর পরনে ছিল সাদা শার্ট আর কালো রঙের প্যান্ট। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। নিচতলা থেকে দুই পুলিশ সদস্য তাঁর দুই বাহু ধরে রাখেন। পরে দুই পুলিশ সদস্যের বাহুর ওপর ভর দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে তিনি আদালতের তিনতলায় ওঠেন। পরে তাঁকে নেওয়া হয় আসামির কাঠগড়ায়। তিনি যখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে পরিয়ে দেওয়া হাতকড়া খোলার উদ্যোগ নেন একজন পুলিশ সদস্য। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাথা নিচু করে ছিলেন। তখন একজন পুলিশ সদস্য তাঁর হাতকড়া খুলে দেন। এ সময় সাবেক প্রধান বিচারপতির ডান হাতে ঝুলছিল হাতকড়া। তিনি কাঠগড়ার মাঝখানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অন্তত এক শ নেতা-কর্মী। আর ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
তখন সময় রাত ৮টা ১০ মিনিট। ঢাকার সিএমএম আদালতের অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (এসিএমএম) মো. ছানাউল্লাহ খাস কামরা থেকে এজলাসে আসেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে একনজর তাকান। এরপর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, ‘আসামি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁকে জামিন দিলে তদন্তকাজে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁকে জামিন দিলে ছাত্র–জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলো উত্তেজিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিচারের পূর্ব পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করছি।’
আইনজীবী খোরশেদ আলম বলেন, ‘মাননীয় আদালত, সাধারণ মানুষ যেভাবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ঘৃণা করেন, ঠিক একইভাবে সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকেও মানুষ ঘৃণা করেন। আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি অন্তর্বর্তী সরকারকে গণতন্ত্র হত্যা করার জন্য দায়ী এই সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করাযর জন্য। কিন্তু কেন তাঁকে আজ রাতে নিয়ে আসা হলো। কারণ, দিনের বেলা জনগণ খবর পেলে এই আদালতে চলে আসতেন।’
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যখন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল, তখন খায়রুল হক ম্যাজিস্ট্রেটের মুখের দিকে চেয়ে ছিলেন। আবার তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে তাঁর সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল, তিনি শুনছিলেন। তাঁর পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
বাদীপক্ষের বক্তব্য শেষ হলে আদালত বলেন, যেহেতু তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে, তাঁর পক্ষে জামিনের কোনো আবেদন করা হয়নি, এ পর্যায়ে তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আদেশ দেওয়া হচ্ছে।