ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম একদম তলানিতে, তবুও দেশটির পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভাটা পড়েছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা এই দুরবস্থায় হতবাক হলেও এর নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রচেষ্টা।
নয়াদিল্লি অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পেঁয়াজ রপ্তানিতে বারবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বাংলাদেশ এখন বিকল্প উৎস হিসেবে পাকিস্তান ও চীনের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে ভারতের দীর্ঘদিনের এই একচ্ছত্র আধিপত্য এখন হুমকির মুখে।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার পেঁয়াজ বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের আমদানি নীতি পরিবর্তনের কারণে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রধান রপ্তানি বাজার ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা আশানুরূপ পরিমাণে পেঁয়াজ কিনছে না। এতে সরাসরি ধাক্কা খেয়েছে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারক ও কৃষকরা।সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন এসব তথ্য উঠে আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ আগের মতো ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করছে না। এর ফলে মহারাষ্ট্র, মধ্য প্রদেশ ও গুজরাটের কৃষকদের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে। রপ্তানি কমে যাওয়ায় দেশটির পাইকারি বাজারেও ব্যাপক মন্দা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ ভারতের নিজস্ব নীতি–অস্থিরতা। গত কয়েক বছরে স্থানীয় বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটি বারবার পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক বৃদ্ধি বা সীমিত রপ্তানির মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বড় আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে ভারত-নির্ভরতা কমিয়ে পাকিস্তান, চীন এবং মিয়ানমারের দিকে ঝুঁকছে।
এ ছাড়া ভারতীয় বীজ ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলো নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পেঁয়াজ বীজের নিয়ন্ত্রণ হারানো ভারতের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এক সময় যারা ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করত, তারা এখন নিজেদের উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে—ফলে ভারতের বাজার সংকুচিত হচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশের বাজার হারানোর প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি পড়ছে তাদের ওপর। এক সময় যেখানে বাংলাদেশ ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, সেখানে এখন অর্ডার প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ভারতের উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেছে, যা কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে।সৌদি আরবও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি কমিয়েছে। দেশটি এখন পাকিস্তান ও চীন থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহ করছে। ফলে ভারতের রপ্তানি খাত আরও সঙ্কটে পড়েছে।
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এর আগেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ছয় মাস এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ মাসের জন্য রপ্তানি নিষিদ্ধ ছিল।
এই ঘন ঘন নিষেধাজ্ঞার ফলে যেসব বাজার ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ২০২০ সালে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ একটি কূটনৈতিক নোটও পাঠিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব কৃষকদের সুরক্ষা দিতে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে না।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭.২৪ লাখ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল, যা ওই বছর ভারতের মোট ১৭.১৭ লাখ টন রপ্তানির ৪২ শতাংশ ছিল। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে ভারত বাংলাদেশে মাত্র ১২,৯০০ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করতে পেরেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ভারতীয় পেঁয়াজ চালানের প্রতি এই অনাগ্রহের কারণ হতে পারে।
ভারতের পেঁয়াজের বাজারে ধস
শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মাহাদিপুর-সোনামসজিদ সীমান্তে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ রুপিতে। ৫০ কেজির এক বস্তা পেঁয়াজের দাম মিলছে মাত্র ১০০ রুপি। অথচ নাসিক থেকে ১৬ রুপি দরে কেনা এসব পেঁয়াজ পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সীমান্তে পৌঁছাতে খরচ পড়েছিল ২২ রুপি। সেই পেঁয়াজ এখন প্রায় বিনামূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে।