জন্মের পর থেকে পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নগর সভ্যতার কোনো স্পর্শ পায়নি আহত বাঘটি। বৈদ্যুতিক আলো দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনো। ঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, শৈত্যপ্রবাহ ও দাবদাহের মধ্যেই কেটেছে তার জীবন। বেড়াবিহীন, মুক্ত সুন্দরবনের গভীর বনে। অথচ আজ সেই বাঘই হাজারো মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি, টানা ১১ দিন ধরে ইট–বালি–সিমেন্টের পাকা ভবনে চিকিৎসাধীন।
খুলনার স্থানীয় বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় পাওয়া এই দুর্বল ও আহত বাঘটি জীবনে প্রথমবারের মতো এন্টিবায়োটিক, ওরস্যালাইন ও গো-মাংসের স্বাদ পাচ্ছে। চিকিৎসার পর তার চলন ও ক্ষিপ্রতায় ইতোমধ্যে আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সুস্থ হলে সিদ্ধান্ত হবে। এই বন্যপ্রাণীকে তার পূর্বের ঠিকানা সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি বিকল্প হিসেবে পাঠানো হবে কোনো সাফারী পার্কে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শোরকির খাল এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে বাঘটি আটকা পড়ে। গত ৩ জানুয়ারি জেলে ও বাওয়ালীরা বিষয়টি বন বিভাগকে জানালে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, ফাঁদে আটকে পড়লেও আঘাতে বাঘটির কোনো হাড় ভাঙেনি। তবে তার বাম পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকায় বাঘটি মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনার পর ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফেরে। প্রথম দিকে ওরস্যালাইন, মুরগি ও গরুর কলিজা দেওয়া হয়। একদিন পর সে খাবার গ্রহণ শুরু করে। খাদ্য গ্রহণের পর তার মধ্যে ধীরে ধীরে ক্ষিপ্রতা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
আহত বাঘটির চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নুর আলী খানের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল খুলনা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসেন। দলে ছিলেন ভেটেরিনারি অনুষদের ড. মো. গোলাম হায়দার, কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. গোলাম আযম চৌধুরী এবং সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালের এডিশনাল ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা। তারা বাঘটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। বন বিভাগের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাদ জুলকার নাইনের নিবিড় তত্ত্বাবধায়নে তার চিকিৎসা চলছে। দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে ব্লো পাইপের মাধ্যমে নিয়মিত এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিদিন খাবার হিসেবে প্রায় ৫ কেজি করে গো-মাংস খাওয়ানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাঘটি পুরোপুরি সুস্থ হলে তার শিকার ধরার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। শিকার ধরার উপযোগী না হলে তাকে বনে ফেরানো হবে না। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে সাফারী পার্কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এখন সকলের অপেক্ষা, প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে গিয়ে সে আবারও সুন্দরবনের রাজা হয়ে উঠতে পারবে কি না।