বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় ঐক্য অনেক সময় পরীক্ষার মুখে পড়ে। খুলনা মহানগর বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি তা প্রমাণ করে দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে খুলনা-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিভক্তির আগুন আরো জ্বালিয়েছেন পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী তিন নেতা নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন, নগর সভাপতি শফিকুল আলম মনা এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
বিগত দুই দশকের রাজনীতিতে একসঙ্গে পথ চললেও ২০২১ সালের শেষের দিকে খুলনায় দলীয় কমিটির গঠন নিয়ে শুরু হওয়া জটিলতা থেকেই উত্থিত হয়েছে তাদের মাঝে বিভেদ। মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমোদনে নগর কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব করা হয় মনা ও তুহিনকে। কিন্তু সেই পদক্ষেপ মঞ্জুর ক্ষোভের কারণ হয়, তিনি দলের প্রধান নেতৃত্বের পদ থেকে কিছু সময়ের জন্য বহিষ্কার হন। এরপর থেকেই মনা-তুহিন জোট বেঁধে মঞ্জুর বিপরীতে অবস্থান নেন। দুই পক্ষ পৃথক কর্মসূচি পালন করে আসছেন সেই থেকে।
জাতীয় নির্বাচনে খুলনা-২ আসনের টিকিট পেতে তৃতীয় ধাপে জটিলতা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে মনোনয়ন চান নগর সাধারণ সম্পাদক তুহিন। গত এপ্রিল থেকে তিনি নগরীতে নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁবু দিয়ে অভিভাবকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা, দুর্গাপূজায় ম-পে অনুদান, সবই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর প্রয়াস। শহরের সদর ও সোনাডাঙ্গা থানার বেশিরভাগ ওয়ার্ডে তুহিনের কর্মী-সমর্থক শক্তিশালী অবস্থানে আছেন।
অন্যদিকে, নগর সভাপতি মনা কেসিসির মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ছিলেন। তবে এখন খুলনা-২ আসনে মনোনয়নের দাবিতে সক্রিয় হয়েছেন। নগরীতে তাঁর পক্ষে লিফলেট বিতরণ হচ্ছে এবং সম্প্রতি গণসংযোগ শুরু করেছেন। মনা দলের ভেতরে তুহিন বিরোধী শক্তিকে সংগঠিত করেছেন বলে অনেক নেতা জানিয়েছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জু যদিও সরাসরি প্রচারে নেই, তবে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে তাঁর সমর্থকরা সক্রিয়। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি দলীয় প্রার্থী হিসেবে শতভাগ আশাবাদী।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মনে করছেন, এ বিভাজনের কারণে দলের ভেতরে উত্তেজনা এবং সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, তিন নেতার কারসাজিতে মাঠের সাধারণ নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। দলীয় ঐক্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা বড় বাধার মুখে। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা বিএনপির ভেতরে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভোটের সময় দল দুর্বল না হয়।
১৯৮৩ সালে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে পা রাখেন শফিকুল আলম তুহিন। মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি ও মহানগর যুবদলের সভাপতি ছিলেন তিনি। ২০২১ সাল থেকে মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। ১০৮ মামলায় জালে আটকা পড়া তুহিন নয় বার জেল খেটেছেন। দলীয় ও জনতার কাছে তিনি জনপ্রিয় নেতাদের মধ্যে একজন।
১৯৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রাজনীতি শুরু করেন শফিকুল আলম মনা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আহ্বানে যোগ দিয়ে ১৮ বছর জেলা বিএনপির এবং চার বছর নগর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি দলের এক প্রভাবশালী নেতারূপে পরিচিত। মামলার মুখে থাকা মনা দু’বার জেলও খেটেছেন।
২৯ বছর ধরে খুলনা নগর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০০৮ সালে খুলনা বিভাগে ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ১৯ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে একবার জেল খেটেছেন। তিনি দলীয় রাজনীতির এক পুরোধা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব।
বিভক্ত এই তিন নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খুলনা মহানগর বিএনপির ঐক্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। দলীয় প্রধানদের কাছে এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এই ভাঙাচোরা অবস্থাকে সামলানো এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে দলকে একক মনোভাব ও শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হয়।