সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৫ বছর ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছেন তাঁর ক্ষমতা। আর্থিক খাত থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তই তিনি ছাড়া নিতে পারতেন না কেউ। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে অবৈধ নিয়োগের সব তথ্য। সে সময় কোনো বিজ্ঞপ্তি এবং পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পান ওই ৪৮ জন।
তাঁদের যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল একটাই—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ। বাধ্য হয়ে তাঁদের নিয়োগ দিলেও কোনো কাজে লাগাতে পারেনি ব্যাংক। সরকার বদলের পর তাঁদের বেশির ভাগই যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংগ্রহণ করেননি। আবার কেউ কেউ অংশগ্রহণ করেও ফেল করেছেন।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কোনো বিজ্ঞপ্তি, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে একসময় পরিচিত ইসলামী ব্যাংক এখন সাত বছরের ব্যবধানে দুর্বল ব্যাংকগুলোর তালিকায় চলে গেছে। ব্যাংকটির এই পতনের সূত্রপাত ঘটে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের শেষ দিকে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১০ জনকে নিয়োগের সুপারিশসহ একটি চিঠি পাঠানো হয়।
সে সময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নান নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে পরে বিষয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তোলা হলে আলোচনা শেষে নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। ওই ১০ জন ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ জানুয়ারির মধ্যে ব্যাংকে যোগ দেন, যে সময় এস আলম গ্রুপ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
পরে নতুন বোর্ড গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আরো ৩৮ জনকে নিয়োগের আরেকটি নির্দেশনা আসে, যা ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা অনুমোদন করে। এদের মধ্যে ৩৭ জন ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল এবং একজন ওই বছরের ১৯ নভেম্বর যোগ দেন।
এভাবে মোট ৪৮ জন কর্মকর্তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে নিয়োগ পান।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৮ জন পরে চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চারজন কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, আর কয়েকজন চাকরি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে বাকি ২৩ জন কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংকে ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি)’ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘মোট ৪৮ জন কর্মকর্তাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।’ সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বর্তমানে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নানও এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, ‘২০১৬ সালের শেষ দিকে আমার কাছে মেজর জেনারেল আবেদীনের পক্ষ থেকে ১০টি সিভি আসে। সেখানে এসব ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নীল কালিতে স্বাক্ষর করা একটি আলাদা কাগজও পাঠানো হয়েছিল। পরে ওই বিষয়টি আমি তৎকালীন চেয়ারম্যান মোস্তফা আনোয়ার সাহেবকে অবহিত করি এবং আমি তাঁকে স্পষ্টভাবে জানাই, এভাবে কোনো নিয়োগ হবে না। কারণ ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাসে এভাবে নিয়মনীতি না মেনে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরে এই বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমি বোর্ডসভায় উপস্থাপন করি। পরে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না আমার জানা নেই। কারণ এর কয়েক দিনের মধ্যেই ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।’
প্রসঙ্গত কোনো বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পাওয়া কর্মীর সংখ্যা আট হাজারের বেশি। এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে প্রায় ১১ হাজার কর্মীকে অনিয়ম করে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সম্প্রতি যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ৪০০ কর্মী ছাঁটাই এবং চার হাজার ৯৫৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এস আলমের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অনিয়মের ফল এখন পুরো ব্যাংককে ঘিরে রেখেছে। ইসলামী ব্যাংককে দ্রুত পুঁজি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অপারেশনাল সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্বহাল করতে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে থাকা ড. কামাল উদ্দীন জসীম বলেন, ‘যাঁদের যোগ্যতা নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ চলছে। ভুয়া সার্টিফিকেটধারীদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। যাঁদের পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে যাঁরা আবেদন করবেন, পরে তাঁদের ন্যায্যভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দক্ষতা ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে যাঁরা যোগ্য হয়ে উঠবেন, তাঁদের বৈধকরণ করা হবে। তবে নিরাপত্তার ঝুঁকি, সাইবার হামলার আশঙ্কা ও আর্থিক প্রভাব মোকাবেলায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ও আইনগত বিচারের কাজ চলবে।’