পূর্বাচল প্লট বরাদ্দে দুর্নীতি পৃথক তিন মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছর, জয়-পুতুলের ৫ বছর কারাদ-

whatsapp sharing button

ঢাকার পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্পে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদ- হয়েছে। পাশাপাশি তিন লাখ টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ১৮ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- ভোগ করতে হবে তাকে।

এদিকে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৫ বছরের কারাদ-ের রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। এছাড়া তাকে এক লাখ টাকার অর্থদ- দেয়া হয়েছে।
মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ৫ বছরের কারাদ- দিয়েছেন আদালত। এছাড়া এক লাখ টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- ভোগ করতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ২৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন ঢাকার বিশেষ জজ-৫-এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালত। দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে রায় পড়া শেষ হয়। রায় ঘোষণার সময় পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিয়মানুযায়ী প্লট বরাদ্দের কোনো আবেদন না করলেও প্লটের দখল বুঝে পেতে ঠিকই আবেদন করেছিলেন। এতে বোঝা যায়, শেখ হাসিনার সম্পদের প্রতি লোভ ছিল।’ পৃথক তিন মামলায় কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে আদালতে হাজির করা হয়। শুরু থেকে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল পলাতক রয়েছেন। শেখ হাসিনা তিন মামলার আসামি। জয় ও পুতুল পৃথক এক মামলার আসামি।

মামলায় আরো ১৯ জনের যে সাজা হয়েছে:
শেখ হাসিনার সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের দুই মামলায় ৬ বছর করে মোট ১২ বছরের সশ্রম কারাদ-। এক লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা অর্থদ-, অনাদায়ে আরোা ৬ মাস করে এক বছরের কারাদ-।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের তিন মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, এক লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ৬ মাস করে দেড় বছরের কারাদ-।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকারের তিন মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, এক লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদ-।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিনের তিন মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, এক লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ৬ মাস করে দেড় বছরের কারাদ-।

সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদারের তিন মামলায় ১ বছর করে মোট ৩ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, পাঁচ, দশ ও পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ১ মাস করে ৩ মাসের কারাদ-।
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার তিন মামলায় ৫ বছর করে মোট ১৫ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লাখ টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ৩ মাস করে ৯ মাসের কারাদ-।

রাজউকের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের তিন মামলায় ৩ বছর করে মোট ৯ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ২ মাস করে ৬ মাসের কারাদ-।
সাবেক মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীর (অব.) তিন মামলায় ৩ বছর করে মোট ৯ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ২ মাস করে ৬ মাসের কারাদ-।

রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদের এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো দুই মাসের কারাদ-।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাসের দুই মামলায় ৩ বছর করে মোট ৬ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকার অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ২ মাস করে ৪ মাসের কারাদ-।

রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলামের দুই মামলায় ৩ বছর করে মোট ৬ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ২ মাস করে ৪ মাসের কারাদ-।

রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলামের এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো দুই মাস কারাদ-।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো: কামরুল ইসলামের এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ২০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো দুই মাস কারাদ-।

রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাফিজুর রহমানের এক মামলায় ১ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো এক মাস কারাদ-।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো: হাবিবুর রহমান সবুজের এক মামলায় ১ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাদ-।

রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফের দুই মামলায় ১ বছর করে মোট ২ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো ১ মাস করে ২ মাসের কারাদ-।

রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মাজহারুল ইসলামের এক মামলায় ১ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাদ-।
রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের তিন মামলায় ১ বছর করে মোট ৩ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি, পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ১৫ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরোা ১ মাস করে ৩ মাসের কারাদ-।

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) মো. শফিউল হকের এক মামলায় ৩ বছরের সশ্রম কারাদ-। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদ- অনাদায়ে আরো ২ মাসের কারাদ-।

এদিকে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকারকে তিন মামলায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে একমাত্র আসামি খুরশীদ আলম কারাগারে রয়েছে। রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। অপর আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

রায় শেষে দুদক প্রসিকিউটর খান মো. মাইনুল হাসান লিপন জানান, ‘আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু তা হয়নি। কমিশনের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে খুরশীদ আলমের আইনজীবী শাহীনুর ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দায়রা আদালতের প্রবেশমুখে বসানো হয় পুলিশের চেকপোস্ট। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
উল্লেখ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার সরকারি প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগে গত ১৪ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক সালাহউদ্দিন। তদন্ত শেষে গত ১০ মার্চ ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া। এই মামলায় ২৯ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

অপরদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার সরকারি প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগে ১৪ জানুয়ারি সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান। তদন্ত শেষে গত ১০ মার্চ আরো দুজনসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান। এ মামলায় আদালতে ২৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।গত ৩১ জুলাই ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এই তিন মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।