খুলনার লবনচরা মুক্তা কমিশনার কালভার্ট এলাকায় ঢুকলেই নাকে আসে এক অদ্ভুত টান— মসলার ঘ্রাণ, ধোঁয়ার কুন্ডলী, আর তার সঙ্গে যেন ভেসে আসে ‘মায়ের হাতের রান্না’র স্মৃতি। এই এলাকা এখন বিরিয়ানি প্রেমীদের নতুন গন্তব্য। স্বাদের দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছে— “ওস্তাদ-সাগরেত বিরিয়ানি ঘর”।
মাত্র ৭৫ টাকায় চিকেন বিরিয়ানি, ডিমসহ ৯০ টাকা। গরুর বিরিয়ানি চাইলে ১২৫ টাকা, আর ডিমসহ মাত্র ১৪০ টাকায়! দাম শুনে অনেকে প্রথমে অবাক হন, পরে মুগ্ধ হন স্বাদে। কারণ এই বিরিয়ানির বৈশিষ্ট্য কেবল দামে সীমাবদ্ধ নয় বরং প্রতিটি গ্রাসেই যেন থাকে যত্ন, আন্তরিকতা আর ঘরোয়া ভালোবাসার ছোঁয়া।
আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো পরিবেশনা— মাটির তৈরি থালা-গ্লাসে পরিবেশিত হয় খাবার। এই প্রাচীন ধারার মধ্যে লুকিয়ে আছে নতুন এক অনুভূতি। খাবার যেন শুধুই খাওয়া নয় বরং একধরনের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, যেখানে খাবারের সঙ্গে মিশে যায় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।
এই অসাধারণ উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা মো. রায়হান তালুকদার। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালেখা শেষ করে একসময় চাকরি করলেও এখন নিজেই বাজার করেন, পরিবেশন করেন। তাঁর লক্ষ্য একটাই— “স্বল্প দামে সবার জন্য মানসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়া।”
রায়হান বলেন, “মানুষ এখন ভালো খাবার চায়, কিন্তু সবার পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয় না। আমি চাই এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে কম টাকায়ও ভালো খাবার পাওয়া যাবে। আমরা নিজেরাই বাজার করি, নিজেরাই রান্না করি, তাই খরচও নিয়ন্ত্রণে থাকে।”
এই আন্তরিক চেষ্টার ফসল ‘ওস্তাদ-সাগরেত’। খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশেপাশের উপজেলা থেকেও ভোজনরসিকরা ছুটে আসছেন। কেউ কেউ বলেন, “খুলনায় অনেক জায়গায় বিরিয়ানি খেয়েছি, কিন্তু এখানে খাওয়ার পর মনে হয়েছে, বিরিয়ানি মানে আসলে এটাই।”
স্বাদের পেছনে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বাবুর্চি মো. আজিজুল হক, যিনি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে রান্নার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, “আমি এমনভাবে রান্না করি যেন নিজের নাতি-পুতেও নিশ্চিন্তে খেতে পারে। কোনো প্রিজারভেটিভ বা নিম্নমানের উপকরণ আমরা ব্যবহার করি না।”
বিরিয়ানি যেমন শুধু খেতে নয়, পার্সেল নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। যারা ব্যস্ত জীবনে একটু ভিন্ন স্বাদ চান, তাদের জন্যও ‘ওস্তাদ-সাগরেত’ এক পরিপূর্ণ ঠিকানা।
নামটাও যেমন ব্যতিক্রমী, অভিজ্ঞতাটাও তেমনি আলাদা। মো. রায়হানের বিশ্বাস, “খাবার কেবল পেট ভরানোর জিনিস না— এটা অনুভব, ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ।” তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগ খুলনায় একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে, যেখানে স্বাদ, সততা ও সংস্কৃতি মিশে তৈরি হয়েছে একটি অনন্য খাবারের গল্প।