সাগর-রুনির চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ডিবি ও র্যাবের পর পিবিআইয়ের নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সও ব্যর্থ হতে চলেছে। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে চিহ্নিত এই দম্পতির ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও দুটি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তী) সরকারও ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই নৃশংস ঘটনা যে দুই খুনি ঘটিয়েছে, এটা নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারীরা।
আদালতে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ নভেম্বর তারিখ ধার্য রয়েছে। প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ পর্যন্ত ১২১ বার সময় নেওয়া হয়েছে। আদালত পিবিআইকে দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে।
হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটেছে তদন্তকারীদের মধ্যে এ নিয়ে দুটি মত রয়েছে। একটি মত হচ্ছে, ভাড়াটে খুনি কিংবা পেশাদার দুজন চোর বা ডাকাত দিয়ে নেপথ্যের কোনো ক্ষমতাবান চক্র এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। ওই ক্ষমতাবান চক্রটি হয়তো ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে সাগর-রুনির ল্যাপটপ ও ফোন কবজায় নেওয়ার পর ওই দুই খুনিকেও দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে কিংবা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। অন্য মত হচ্ছে, গ্রিল কেটে দুই পেশাদার চোর কিংবা ডাকাত সাগর-রুনির বাসায় ঢুকে চুরি করতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই সন্দেহে রাজধানীর পাঁচটি থানার ১৩০টি চুরি-ডাকাতির মামলার ১৪৫ জন আসামিকে (সন্দেহভাজন চোর-ডাকাত) গ্রেপ্তার করে গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্ত করে দেখা হয় এরা জড়িত কিনা। কিন্তু প্রমাণিত হয়, সন্দেহভাজন এসব চোর-ডাকাত এই ঘটনায় জড়িত নয়। অর্থাৎ চুরির ঘটনাটিও প্রমাণিত নয়।
সাগর-রুনির পরিবারেরও সুস্পষ্ট বক্তব্য, ‘গ্রিল কেটে চুরি করতে চোর ঢুকেছে, এই পুরোনো গল্প আর শুনতে চাই না। আমরা জেনেছি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স তাদের তদন্ত কাজ প্রায় সম্পন্ন করে নিয়ে এলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ তাদের ভয়, এটি গ্রহণযোগ্য হবে কিনা এমন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি ও এলিট ফোর্স র্যাবের মতো পিবিআই-এর তদন্তকারীরাও নিশ্চিত দুই খুনি সাগর-রুনির বাসার রান্নাঘরের গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করেছে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে চারজনের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই-এর সহযোগিতায় সেখানকার ল্যাবে এই ডিএনএ পরীক্ষা হয়েছে। সাগর ও রুনির ডিএনএ ম্যাচ করেছে। কিন্তু অন্য দুজনের (খুনি) ডিএনএ ম্যাচ হয়নি। এ সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের PARABON Nanolabs-এ এই পরীক্ষা করে। কিন্তু ডিএনএতে অধিক মিশ্রণজনিত কারণে PARABON SNAPSHOT ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি।’
পিবিআইয়ের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স র্যাবের তৎকালীন কমান্ডার এম সুহায়েল ও মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান, ডিবির মনিরুল ইসলাম, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান, সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সামিট গ্রুপের জ্বালানি পাইপ নিয়ে রিপোর্টের জন্য পাওয়া ডকুমেন্ট সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির কাছে ছিল বলে যে কথাবার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হয়ে আসছে, সে বিষয়েও টাস্কফোর্স সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখেছে। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পায়নি।
এলিট ফোর্স র্যাব তাদের তদন্ত শেষে মামলার রহস্য উদঘাটন এবং খুনিদের শনাক্ত করতে না পারায় ২০২১ সালে ফাইনাল রিপোর্ট দিতে চেয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেননি। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তদন্তকারীদের বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক মামলার নজির আছে, যা রুজুর পর এখনো Undispossal অবস্থায় আছে, এটিও থাক।’
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে হাইকোর্ট চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড মামলাটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র সচিবকে নির্দেশ প্রদান করে। হাইকোর্টের নির্দেশের আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে পুলিশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতিনিধি ও র্যাবের প্রতিনিধি সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আজিজুল হক তদন্ত কাজ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।